হলি আর্টিজান হামলার জঙ্গির পরিবার পেয়েছে প্রধানমন্ত্রীর উপহার!


তারেক আজিজ প্রকাশের সময় : ১৪/০৩/২০২১, ৫:৫৬ অপরাহ্ণ /
হলি আর্টিজান হামলার জঙ্গির পরিবার পেয়েছে প্রধানমন্ত্রীর উপহার!
নিজস্ব প্রতিবেদক : “তোমরা হতাশ হবে না। একজনের গুলি শেষ হলে অপরজন ব্যাকআপ দেবে। মনে রাখবে, আমাদের হারানোর কিছু নেই। অপারেশনের সময় তাড়াহুড়ার দরকার নেই। খুব গুরুত্ব দিয়ে কাজ করবে। আর মুশরেকদের দয়া দেখাবে না। এমনকি সে যদি সাংবাদিকও হয়। সর্বদা জিকিরের মধ্যে থাকবে। যদি কেউ বন্দি হয়ে যাও, তাহলে নিজে নিজেকে শেষ করে দিবে। আর একটা জিনিস মনে রাখবে যে, হলি আর্টিজানের গেইট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলেই আমরা সফল। কারণ, বিশ্ব জেনে যাবে যে বাংলাদেশেও হামলা হয়েছে। তাই শুধু হামলা হলেই আমরা সফল। আমাদের হারানোর কিছু নেই, আমরা বিজয়ী।”
হলি আর্টিজানে হামলার আগেরদিন বসুন্ধরার একটি বাসায় হামলার চূড়ান্ত পরিকল্পনার সময় মূল হামলাকারীদের উদ্দেশ্যে এমনই উদ্বুদ্ধকরণ খুতবা/বয়ান দিয়েছিলেন হামলার অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী সারোয়ার জাহান ওরফে মানিক। হামলার কয়েকদিন আগে থেকে নিয়মিত জঙ্গীদের বিভিন্ন তাত্বিক জ্ঞান ও উদ্দীপনামূলক বক্তব্য দিতেন সারোয়ার জাহান। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলায় অন্যতম মাস্টার মাইন্ড ও অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করেছেন সারোয়ারের নাম।
সারোয়ার জাহান ওরফে মানিকের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার দলদলী ইউনিয়নের মুশরীভুজা গ্রামে। বৈশ্বিক জঙ্গি সংগঠন আইএসআই’র আদলে গড়ে উঠা নব্য জেএমবি সংগঠনের শীর্ষ নেতা সারোয়ার জাহানের পরিবার পেয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের উপহার! ভূমিহীন কিংবা ২ শতকের নিচে জমি থাকা পরিবার জমিসহ ১ লক্ষ ৭১ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাড়ি পাওয়ার কথা থাকলেও জঙ্গি সারোয়ারের বড় ভাই মনিরুলের পৈত্রিক সম্পত্তি রয়েছে ১৪ শতকের বেশি। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, কিভাবে একজন জঙ্গি পরিবারের সদস্য পেয়েছে প্রধানমন্ত্রীর উপহার! জঙ্গি সারোয়ারের পরিবার ও ইউপি চেয়ারম্যানের দাবি, ভূমিহীন দরিদ্র হওয়ার সুবাদেই বাড়ি পেয়েছে তারা। অথচ জমির কাগজপত্রে (খতিয়ান) দেখা যাচ্ছে, সারোয়ারের বাবা আব্দুল মান্নানের নামে দুটি খতিয়ানে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ জমি রয়েছে। এতে পৈত্রিক সূত্রে দেশে প্রচলিত আইনানুসারে ১৪ শতকেরও বেশি জমি রয়েছে সারোয়ারের ভাই মুদি দোকানী মনিরুল ইসলামের নামে। উপজেলা প্রশাসন বলছে, ইউপি চেয়ারম্যান ও স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দের সুপারিশেই পরিবারটিকে দেয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর উপহার।
শুধু জঙ্গি পরিবার নয়, ভোলাহাট উপজেলায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাড়ি দেয়া নিয়ে রয়েছে নানা অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ। দলদলী ইউনিয়নের ০৬নং ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম ঢাকা পোস্টকে বলেন, এই গ্রামে অনেক হতদরিদ্র মানুষ রয়েছে। যারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই উপহার পাওয়ার যোগ্য। অথচ তা না করে জমি রয়েছে এমন জঙ্গি পরিবারের সদস্যকে বাড়ি দেয়া হয়েছে। অবাক করার বিষয় চূড়ান্তভাবে বাড়ি প্রদানের আগেই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর অভিযোগ হলেও অজ্ঞাত কারনে পরিবারটিকে বাড়ি দেয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার বাইরে গিয়ে বাড়িটি দেয়া হয়েছে জানিয়ে এই যুবলীগ নেতা আরো বলেন, দলদলী ইউনিয়নে এখনো অনেক ভূমিহীন, অসহায়, দরিদ্র পরিবার বসবাস করছে। এমন কয়েকটি বাড়ি দেয়া হয়েছে, দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো কেউ বসবাস করছে না। গরু-ছাগলের বসবাস ও গাঁজাখোরদের আস্তানা হিসেবে রয়েছে এসব বাড়ি। সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়েও এর সত্যতা মিলেছে।
গ্রামের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম জানান, ভোলাহাটে সবগুলো বাড়ি যোগ্য পরিবারগুলো পায়নি। আরেকটা বাড়ি আছে, সেখানে বসবাস করে। অথচ এমন পরিবারগুলোও বাড়ি পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপহার দেয়া বাড়িগুলোতে বসবাস করছে গরু-ছাগল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শিক্ষক বলেন, বাস্তবে গরিব, অসহায়, দুস্থ, ভূমিহীন পরিবারগুলো আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাড়ি পেলে প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগ সার্থক হয়। কিন্তু ভোলাহাটে এটি হয়নি। অসহায়, ভূমিহীন পরিবারগুলো বাড়ি পাওয়ার কথা থাকলেও, তারা না পেয়ে বাড়ি ও জমি রয়েছে এমন পরিবার বাড়ি পেয়েছে। যারা আশ্রয়ণ প্রকল্পে প্রধানমন্ত্রীর উপহার পাওয়ার যোগ্য তাদেরকেই দেয়ার দাবি ও বিষয়টি খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি।
দলদলী ইউনিয়ন পরিষদের ০৬ নং ওয়ার্ড সদস্য জানান, কে বা কারা হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পরিকল্পনাকারী সারোয়ার জাহানের ভাই মনিরুলকে বাড়ি প্রদানের বিষয়ে আগেই অভিযোগ করে।
পরে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও ইউপি চেয়ারম্যান তদন্ত করার পর মনিরুলকে বাড়িটি দেয়া হয়েছে।
জঙ্গি সারোয়ার জাহান ওরফে মানিকের সাথে পরিবারের কোন সম্পর্ক ছিলো না জানিয়ে তার (জঙ্গি সারোয়ার) ভাবি সালমা খাতুন বলেন, আমার শশুরের জমিজমা ছিলো, কিন্তু তিনি তা বিক্রি করে শেষ করছেন। কোনরকমে মুদি দোকানের মাধ্যমে সংসার চালায়, তাই বাড়িটি আমাদের দেয়া হয়েছে। বাড়ি পাওয়ার পেছনে জায়গাটিতে (যেখানে বর্তমানে বাড়িটি নির্মাণ করা হয়েছে) নিজেদের গর্ত ভরাট করাকেই অন্যতম কারন বলছেন সালমা খাতুন।
দলদলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আরজেদ আলী ভুটু বলেন, কোন অনিয়ম নয়, সঠিকভাবে এলাকাবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে দেয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর উপহার। জঙ্গি সারোয়ারের পরিবার জমি থাকা স্বত্বেও বাড়ির পাওয়ার বিষয়ে ভোলাহাট উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রাব্বুল হোসেন আনুষ্ঠানিকভাবে ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে তিনি এবিষয়ে নিজের সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করেন।
ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দেয় না জানিয়ে মুঠোফোনে ভোলাহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মশিউর রহমান বলেন, মনিরুলের জমি আছে, এটা আমাদের জানা নেয়। জঙ্গি সারোয়ার জাহানের পরিবারের লোক ও জমি থাকা নিয়ে একটি অভিযোগ হলেও শুধুমাত্র ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য, চেয়ারম্যান এবং স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দের সুপারিশে পরিবারটিকে বাড়ি দেয়া হয়েছে। এছাড়াও উপজেলায় প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পে কোন অনিয়ম হয়নি বলেও জানান তিনি।
হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার মূল পরিকল্পনাকারী সারোয়ার জাহান ওরফে মানিকের পরিবারকে জমি থাকা স্বত্বেও প্রধানমন্ত্রীর উপহার দেয়া প্রসঙ্গে ভোলাহাট উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ইয়াসিন আলী শাহ বলেন, প্রশাসন উপজেলা আওয়ামীলীগের সাথে সমন্বয় বা পরামর্শ না করেই জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে আশ্রয়ণ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে। তাই মনিরুলের বাড়ি পাওয়াসহ আশ্রয়ণ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠছে এমন বিষয়গুলো আবারো খতিয়ে দেখার দাবি জানান তিনি। আ.লীগ নেতা বলেন, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দুজনই আ.লীগের নেতা। অথচ তাদের নিজ এলাকায় এমন অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেন তিনি।
জঙ্গি কার্যক্রম নিয়ে গবেষণা করেন এমন একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক আব্দুল আহাদ (ছদ্মনাম) তিনি বলেন, জঙ্গি পরিবারকে এই বাড়িটি দেয়ার মাধ্যমে অন্য তরুণদের উৎসাহ দেয়া হয়েছে। কারন এই ঘটনার মধ্য দিয়ে নবাগত জঙ্গিরা নিজেদের পরিবারকে আরো বেশি সুরক্ষিত মনে করবে। এতে জঙ্গি সংগঠনগুলোর কার্যক্রমে আরো বেশি গতি আসবে এবং আত্মঘাতী হামলার পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। জেলা প্রশাসক মঞ্জুরুল হাফিজ বিষয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন করে খতিয়ে দেখবেন বলে ঢাকা পোস্টকে জানিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, কারও কাছে তিনি মোক্তার, কারও কাছে নাজমুল ইসলাম। কেউ চেনেন আবদুর রহমান আয়নাল নামে, কেউ আসিম আজওয়াদ নামে। তবে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র‍্যাব দাবি করেছে এই ব্যক্তির প্রকৃত নাম সারোয়ার জাহান। র‍্যাবের দাবি যদি অনুযায়ী, বাংলাদেশের ইতিহাসে এযাবতকালের সবচেয়ে ভয়ংকর এবং দুঃসাহসিক সব সন্ত্রাসী হামলার নেপথ্যের মূল ব্যক্তি তিনি। সাবেক র‍্যাব মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, সারোয়ার জাহানই ছিলেন বাংলাদেশে নব্য জেএমবির প্রধান নেতা। গুলশানে হোলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে হামলা, শোলাকিয়ায় ঈদের জামায়াতে সন্ত্রাসী হামলা সহ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ২২টি সন্ত্রাসী হামলা তার নেতৃত্বেই পরিচালিত হয়। বিবিসি বাংলার একটি সংবাদে বলা হয়, আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংগঠন ইসলামিক স্টেট দাবি করে, বাংলাদেশে তাদের সন্ত্রাসী সংগঠনের প্রধান ব্যক্তি হচ্ছেন আবু ইব্রাহীম আল হানিফ। বাংলাদেশ সরকার ইসলামিক স্টেটের কোন সাংগঠনিক অস্তিত্বের কথা স্বীকার করে না। কিন্তু ইসলামিক স্টেট বা নব্য জেএমবি, যে নামেই এরা বাংলাদেশে তৎপরতা চালিয়ে থাক, এই সারোয়ার জাহানই হতে পারেন আইএস এর কথিত আবু ইব্রাহীম আল হানিফ।