পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ কম, তবু দাম বাজারে তিনগুণ


তারেক আজিজ প্রকাশের সময় : ০৯/০২/২০২৪, ১১:১৭ অপরাহ্ণ /
পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ কম, তবু দাম বাজারে তিনগুণ

এক মাস আগে যে পেঁয়াজ প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছিল ৭৫ থেকে ৮০ টাকায়, সেই মুড়িকাটা পেঁয়াজই এখন বিক্রি হচ্ছে ১০৫ টাকায়। এক মাসের ব্যবধানে কেজিতে ২৫ থেকে ৩০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, মুড়িকাটা পেঁয়াজের উৎপাদন খরচ আগে যা ছিল এখনও তাই আছে। পরিবহন খরচও একই। তাহলে এখন পেঁয়াজের দাম কেন বাড়ছে?

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘চালের চেয়ে পেঁয়াজের দাম বেশি হওয়াটা অযৌক্তিক। কারণ চাল উৎপাদন কষ্টসাধ্য। চাল উৎপাদনে খরচও বেশি হয়। তারপরও পেঁয়াজের দাম বাজারে বেশি হওয়ার মানে হচ্ছে এখানে অতিমুনাফা করার জন্য কারসাজি করে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাজার মনিটরিংয়ের দুর্বলতার কারণেই এখন পেঁয়াজের দাম বাড়ছে। বাজার তদারকির দায়িত্বে যারা আছেন, তারা যদি ঠিকমতো বাজার মনিটরিং করতেন, তাহলে কখনও হুট করে দাম বেড়ে যেতে পারে না। ব্যবসায়ীরাই কারসাজি করে এই দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন।’

ভোগ্যপণ্যের অন্যতম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের আড়তদাররা জানিয়েছেন, বাজারে চাহিদা থাকায় কৃষক পর্যায়েই পেঁয়াজের দাম বাড়ছে। কৃষকদের কাছ থেকে যারা পেঁয়াজ নিয়ে আসছেন, তাদের দামেই আমাদের বিক্রি করতে হচ্ছে। অথচ এই পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ পড়ছে অনেক কম। কৃষক পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এখন এক কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ পড়ছে ২৯ থেকে ৩০ টাকা।

ফরিদপুরের পেঁয়াজচাষি মো. মামুন বলেন, এক কাঠা জমিতে পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ পড়ে প্রায় ৩ হাজার থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার টাকা। আর কাঠাপ্রতি মুড়িকাঠা পেঁয়াজ উৎপাদন হয় তিন থেকে সাড়ে তিন মণ। এই হিসাবে তিন মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ হয় সাড়ে তিন হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে একজন কৃষকের খচর হচ্ছে ২৯ টাকা। এই ২৯ টাকার উৎপাদন খরচের পেঁয়াজ এখন প্রতি কেজি বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১০৫ টাকায়। অন্যদিকে এক কেজি চাল উৎপাদনে খরচ হয় এর চেয়ে বেশি। এক কেজি চাল উৎপাদনে কত টাকা খরচ পড়ে জানতে চাইলে বাঁশখালীর কালিপুরের কৃষক অমলেন্দু চৌধুরী বলেন, ‘এক কানি (৪০ শতক) জমিতে ধান চাষে খরচ হয় ১৯ হাজার ৫০০ থেকে ২০ হাজার টাকা। এক কানি জমি থেকে গড়ে ধান পাওয়া যায় ৬০ থেকে ৭০ আড়ি (এক আড়ি সমান ১০ কেজি)।’ এই হিসেবে এক কাঠা জমিতে ধান চাষে খরচ পড়ে ৭৯৫ টাকা। এ থেকে ধান পাওয়া যায় আড়াই থেকে পৌনে তিন আড়ি। অর্থাৎ ২৫ থেকে ২৮ কেজি ধান।

কৃষক অমলেন্দু চৌধুরী জানান, প্রতি আড়ি (১০ কেজি) ধান ভাঙালে সেখান থেকে চাল পাওয়া যায় ৭ কেজি। এই হিসেবে এক কাঠা জমির ধান ভাঙালে চাল পাওয়া যায় ১৯ থেকে ২০ কেজি। এতে ধান ভাঙানোর টাকা ছাড়াই প্রতি কেজি চালের উৎপাদন খরচ পড়ে প্রায় ৪০ টাকা। এই ৪০ টাকা উৎপাদন খরচের চাল প্রতি কেজি পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা।

চাল উৎপাদনে খরচ বেশি পড়ছে না শুধু, চাল উৎপাদনে কষ্টও অনেক বেশি। কারণ চাল উৎপাদনে প্রথমে ধানের চারাগাছ রোপণ করতে হয়, এরপর প্রায় তিন মাস ধানগাছের পরিচর্যা করতে হয়। জমিতে সার, কীটনাশক ছিটাতে হয়। এরপর ধান পাকার পর কাটতে হয়, রোদে শুকাতে হয়। ওই ধান সেদ্ধ করে, সেগুলো মিলে নিয়ে ভাঙাতে হয়। তারপরই ধান থেকে চাল পাওয়া যায়। তাই চাল উৎপাদনে যে কষ্ট হয় সেই তুলনায় পেঁয়াজ উৎপাদনে কষ্ট একেবারে কম। কারণ পেঁয়াজ উৎপাদনে জমিতে পেঁয়াজের চারা রোপণ করার পর সেগুলো সার-কীটনাশক দিয়ে পরিচর্যা করতে হয়। এরপর ফসল তোলার সময় হলে সেগুলো জমি থেকে তুলে শুধু শুকিয়ে বাজারজাত করা হয়। ফসল তোলার পর বাজারজাত করতে এর বেশি আর কোনো খরচ নেই।

চাক্তাই খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন বলেন, একটি পণ্যের দাম এভাবে হুট করে বেড়ে যাওয়াটা আমাদের ব্যবসায়ীদের জন্য খারাপ। কারণ হুট করে যখন দাম বেড়ে যায়, তখন যারা ওই পণ্যটি যদি বিক্রির জন্য কেনেন, পরে আবার দাম পড়ে গেলে তারা লোকসানের মুখোমুখি হন। তিনি বলেন, বাজারে পণ্যের দাম হঠাৎ ওঠানামা করলে শুধু ভোক্তা নয়, ব্যবসায়ীরাও লোকসানে পড়েন। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হলে স্থিতিশীল বাজারের বিকল্প নেই।