অনিয়ম-অব্যবস্থাপনায় সেবার মান কমেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে


তারেক আজিজ প্রকাশের সময় : ০৫/১০/২০২০, ৭:৩৩ অপরাহ্ণ /
অনিয়ম-অব্যবস্থাপনায় সেবার মান কমেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে
কপোত নবী : চাঁপাইনবাবগঞ্জ মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র-ম্যাটানিতে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারনে সেবার মান কমেছে৷ সেবাগ্রহীতাদের বিভিন্ন অভিযোগ, সেবা পেতে গিয়ে নানা হয়রানি ও কাঙ্খিত সেবা না পাওয়ার।
সেবাগ্রহীতাদের সাথে দুর্ব্যবহার, নিদিষ্ট ক্লিনিকে আলট্রাসোনোগ্রাম করতে বাধ্য করা, ডাক্তার ও প্রভাবশালী মহলের আত্মীয়-স্বজন ছাড়া সিজার না করা, রাজস্ব খাতে জমা না করে উর্পাজিত অর্থ আত্মসাৎ, প্রতিবছর আসা সংস্কার বাজেটের কাজ না করে অর্থ ও গর্ভবতীদের জন্য আসা ওষুধ লোপাট করাসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র-ম্যাটানিতে কর্তব্যরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, ম্যাটানির মেডিকেল অফিসার ডা. আনোয়ার জাহিদ রুবেনের কাছে চিকিৎসা নিতে গেলেই সকল গর্ভবতীদের নিদিষ্ট করে সেবা ক্লিনিকে আলট্রাসোনোগ্রাম করতে পাঠানো হয়। অন্য কোথাও কেউ আলট্রাসোনোগ্রাম করে আসলে তাকে আবারো সেবা ক্লিনিকে তা করতে বলা হয়। এমনকি অন্য কোথাও করে আসা রোগীর রিপোর্ট ছুড়ে ফেলেছেন সেবা ক্লিনিকের চিকিৎসক চাঁপাইনবাবগঞ্জ মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার ডা. আনোয়ার জাহিদ। এছাড়াও গেটে থাকা দারোয়ানকে রোগীদের সেই নিদিষ্ট ক্লিনিকে আলট্রাসোনোগ্রাম করতে যেতে বলতে বলেন ডা. আনোয়ার জাহিদ।
সদর উপজেলার গোবরাতলা ইউনিয়নের মহিপুর গ্রাম থেকে চিকিৎসা নিতে আসা এক গর্ভবতী নারী বলেন, এখানে সেবা নিতে এসে উল্টো হয়রানি হতে হয়। ঠিকমতো রোগী দেখেন না। এমনকি দারোয়ানরাও খুব বাজে ব্যবহার করে। ডাক্তারের দেখায় পায় না, ভিজিটররাই চিকিৎসা করেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার জোড়বাগান মহল্লার মোসা. বর্ষা খাতুন বলেন, ওষুধ নিতে গেলে নাই বলে তাড়িয়ে দেয়। ইসলামিক হাসপাতালে আলট্রাসোনোগ্রাম করায় পরিদর্শকারা বলেন, ওখান থেকে আসলে আমাদের এখানে (ম্যাটানি) আসবে না। এমনকি সিজারের সময়ও অকথ্য ভাষায় কথা বলে পরিদর্শকারা।
গর্ভবতী থাকাকালীন সময়ে পৌরসভা থেকে মাতৃত্বকালীন ভাতা পাওয়ার কথা ছিলো ফেরদৌসী বেগমের। তবে এর আগে প্রয়োজন ছিলো মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার ডা. আনোয়ার জাহিদ রুবেনের সাক্ষরের। ফেরদৌসী বেগম জানান, সাক্ষর নিতে গেলে ডা. জাহিদ রুবেন অপমান করে বলে আমি কি এসব করার জন্যই আছি। দিতে পারবো না, যাও। আর এই সাক্ষর না পাওয়াতে ১০ হাজার টাকা থেকে বঞ্চিত হন রাজমিস্ত্রী স্বামীর স্ত্রী ফেরদৌসী।
জন্মনিয়ন্ত্রণের অন্যতম উপায় ইমপ্লান্ট ডাক্তাররা করার কথা থাকলেও তা করেন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শকা। অথচ তার অর্থ রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আদায় করেন ডা. আনোয়ার জাহিদ রুবেন। প্রত্যেক বছর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের সংস্কার ও মেরামত কাজ করতে অর্থ বরাদ্দ হয় ৩০ লক্ষ টাকা। তবে প্রতিবছর  বিপুল পরিমান অর্থ বরাদ্দ হলেও সংস্কার বা মেরামতের কোন ছোঁয়া লাগে না ম্যাটানিতে। দোতলায় যে ওয়ার্ড রয়েছে, তা দেখে কোনভাবেই বোঝার উপায় নেয়, এটি সন্তান প্রসব করা রোগীদের থাকার জায়গা।অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারনে থাকার অনুপযোগী প্রায় ২০ সজ্জার ওয়ার্ডে।
সাধারণ গর্ভবতীদের জন্য সিজার করা এখানে দুর্লভ। কারন এখানে শুধুমাত্র ডাক্তার ও প্রভাবশালী মহলের আত্মীয় স্বজনদেরই সিজার করা হয়। বাকি সাধারণ গর্ভবতীদের সিজার করার জন্য নিদিষ্ট ঠিকানা বাতলে দেয়া হয় যথারীতি সেবা ক্লিনিক। এনিয়ে কথা হয় একজন গর্ভবতীর স্বজনের সাথে। তিনি বলেন, এখানে আসার পর ডাক্তার আমাদের সেবা ক্লিনিকে সিজার করতে পাঠান। আমরা মূলত কম খরচে করার জন্যই সরকারি হাসপাতাল এসেছিলাম। কিন্তু সেবা ক্লিনিকে গিয়ে অনেক টাকা খরচ হয়ে যায় রাজমিস্ত্রী স্বামীর। যদি এখানে সিজার না করায় যাবে তাহলে সরকার এতো টাকা দিয়ে এসব করে রেখেছে কেন?
যে পরিমান ওষুধ ও সরঞ্জাম প্রতিবছর ম্যাটানিতে আসে, তার বিশাল অংশই থেকে যাওয়ার কথা। কারন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শকাদের দেয়া বক্তব্যে জানা যায়, এখানে যে বাজেট আসে তার তুলনায় ডেলিভারি ও সিজারের সংখ্যা অনেক কম। অভিযোগ রয়েছে, এর সবগুলোই আত্মসাৎ করেন ডা. আনোয়ার জাহিদ এবং তার এসব অনিয়মের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন, সিনিয়র পরিবার কল্যাণ পরিদর্শকা মোসা. ইসমেতারা, অফিস সহায়ক তোফিয়া খাতুন ও অন্যান্য কর্মচারীসহ কয়েকজন।
জানা যায়, গত শনিবার অন্যান্য পরিদর্শকাদের উপস্থিতিতে একজন পরিদর্শকা সাংবাদিকদের বক্তব্য দেয়ার কারনে বর্তমানে বিভিন্ন হুমকি ও রোষানলে রয়েছেন মেডিকেল অফিসার ডা. আনোয়ার জাহিদ ও সিনিয়র পরিদর্শকা মোসা. ইসমোতারাসহ অনিয়মের সাথে জড়িত সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর। এমনকি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাক্ষর নিয়ে বক্তব্য দেয়া পরিদর্শকার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট অভিযোগ করার সিধান্ত নেয়া হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার  ডা. আনোয়ার জাহিদ বলেন, ৬ জন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শকা নিয়ে খুব ভালোভাবে সেবা প্রদান করা হচ্ছে। এমনকি মহামারী করোনাকালীন সময়েও সমান তালে সেবা দিয়ে আসছে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র। সিজারের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের অ্যানেসথেসিয়া ডাক্তার নেয়। তাই ব্যাটে-বলে না মিললে এখানে সিজার সম্ভব হয়না। তবে নিদিষ্ট ক্লিনিকে আলট্রাসোনোগ্রাম করতে বলার কথা তিনি অস্বীকার করেন। অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে তিনি জানান, সকল উপার্জিত অর্থ রাজস্ব খাতে জমা হয় এবং এখানে কোন অনিয়মের কোন সুযোগ নেয়।